কয়েক দশক আগেও বাংলার গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ গৃহস্থের বাড়িতেই ছিল কাচারি ঘর। কাচারি ঘর ছিলো গ্রাম বাংলার ইতিহাস ঐতিহ্য,কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি অংশ। আলোচনা, শালিস বৈঠক, গল্প-আড্ডার আসর,বসতো কাচারি ঘরে। কালের বিবর্তনে আজ কাচারি ঘর বাঙালির সংস্কৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। কয়েক দশক আগেও সমাজের অবস্থাপন্ন বাড়িতে দেখা যেতো মূল বসরবাড়ি থেকে একটু দূরে আলাদা খোলামেলা জায়গায় রয়েছে কাচারি ঘর। একসময়ের কাচারি ঘর হয়ে গেছে এখন ড্রইং রুম।সরেজমিনে যশোরের অভয়নগর উপজেলায় গ্রামীণ জনপদে সেই ঐতিহ্যবাহী কাচারি ঘর দেখা পাওয়া যায়নি।
অতিথি, পথচারী কিংবা সাক্ষাৎ প্রার্থীরা এই ঘরে এসেই বসতেন প্রয়োজনে এক-দুই দিন রাত যাপনেরও ব্যবস্থা থাকতো কাচারি ঘরে। কাচারি ঘর ছিল বাংলার অবস্থাসম্পন্ন ও মধ্যবিত্তের গৃহস্থের আভিজাত্যের প্রতীক। চারিদিকে টিনের বেড়া সঙ্গে কাঠের কারুকাজ করে উপরে টিন অথবা ছনের ছাউনি থাকতো কাচারি ঘরে। যা অতি প্রাকৃতিকবান্ধব পরিবেশ দিয়ে বেষ্টিত ছিল। তখনকার যুগে বৈদ্যুতিক পাখা না থাকলে কাচারি ঘরের পরিবেশ ছিল আরামদায়ক শীতল । তীব্র গরমেও কাচারি ঘরের খোলা জানালা দিয়ে হিমেল বাতাস বইতো।
আগের দিনে নিজেদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে মানুষজন বেশি হলে ছেলেরা কাচারি ঘরে থাকতেন আর মেয়েরা থাকতেন ভিতর বাড়িতে। বর্ষা মৌসুমে গ্রামের লোকজনদের উপস্থিতিতে কাচারি ঘরে বসতো পুঁথি পাঠ ও জারি গান । পথচারীরা এই কাচারি ঘরে ক্ষণিকের জন্য বিশ্রাম নিতেন। বিপদে পরলে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা থাকতো কাচারি ঘরে। গৃহস্থের বাড়ির ভিতর থেকে খাবার পাঠানো হতো কাচারি ঘরের অতিথিদের জন্য। আবাসিক গৃহশিক্ষকের (লজিং মাস্টার)ও আররি শিক্ষার ব্যবস্থার জন্য কাচারি ঘড়ের অবদান অনস্বীকার্য। মাস্টার ও আররি শিক্ষকদের কাচারি ঘরে থাকার ব্যাবস্থা করা হত। কোন কোন বাড়ির কাচারি ঘর সকাল বেলা মক্তব হিসেবেও ব্যবহৃত হত। জানা যায়, জমিদার প্রথার সময়ও খাজনা আদায় করা হতো গ্রামের প্রভাবশালী গ্রাম্য মোড়লের বাড়ির সামনের কাচারি ঘরে বসে। এখন আর কাচারি ঘর তেমন চোখে পরে না। সব কাচারি ঘর বিলুপ্তি হয়ে পড়েছে ইটপাথরের ছোঁয়ায়। অভয়নগর উপজেলার বাঘুটিয়া ইউনিয়ন, সিদ্দিপাশা ইউনিয়ন, শ্রীধরপুর ইউনিয়নসহ বেশকিছু গ্রামে কাচারি ঘর দেখা গেলেও তা পড়ে আছে ছিন্নভিন্ন পরিত্যক্ত অবস্থায়।
বাঘুটিয়া ইউনিয়নের ভাটপাড়া গ্রামের মাহাতাবউদ্দিন নামের ৭০ বছর বয়সী একজন জানান, আগের দিনে সামাজিক বিচার সালিশি অনুষ্ঠিত হতো কাচারি ঘরে। পাড়ার সবাই একত্রিত হয়ে আমরা সমাজের ভালো মন্দ বিষয়ে আলোচনা করার কেন্দ্র স্থান ছিলো কাচারি ঘর। যা এখনকার সময় চোখে পড়েনা। তিনি আরো বলেন, আগে মানুষের মধ্যে মিল মহব্বত ছিল, এখন কারোর মাঝে মিল মহব্বত খুঁজে পাওয়া যায়না। যে সবাই মিলেমিশে কাচারি ঘরে বসে আড্ডাবাজি করবো। তাই কাচারি ঘর সব বিলুপ্তি হয়ে পড়েছে। দুই একটা দেখা গেলেও তা কোন কাজে আসেনা।
একুশে সংবাদ/ এস কে
আপনার মতামত লিখুন :